দৈনিক তাজা খবর, সীতাকুন্ড প্রতিনিধিঃ
জঙ্গল সালিমপুর উচ্ছেদ করতে গিয়ে এলাকাবাসীর মুখোমুখি আগ্রাসী প্রসাশন, নিজেদের ঘর বাড়ি রক্ষার জন্য সংঘর্ষ পুলিশের সাথে এলাকাবাসীর।

গতকাল চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সালিমপুর ছিন্নমূল বস্তি এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে বস্তিবাসীদের বাধার মুখে পড়ে অভিযানকারী দল। এর ফলে সংঘর্ষে কমপক্ষে ৩০ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছে।
গতকাল বেলা ১টার দিকে জেলা প্রশাসনের দলটি উচ্ছেদের জন্য আলীনগর এলাকায় পৌঁছায়। উচ্ছেদ শুরু করার সাথে সাথে আলী নগরবাসী নিজেদের ঘরবাড়ি রক্ষার জন্য এগিয়ে আসে এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে পুলিশের পাথর ছোড়াছুড়ির ঘটনা ঘটে। পরে সেখানেও পুলিশ ফাঁকা গুলি ও গ্যাস সহ রাবার বুলেট ছোড়ে। এসময় অন্তত ২৫ জন গুলিবিদ্ধ হয় বলে দাবি স্থানীয়দের।

গুরুত্ব আহত ৬ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহতরা হলেন- মো. আলী রাজ হাসান সাগর (২৬), বাবলু মন্ডল (২৮), আমেনা বেগম (৩৫), আমেনা বেগম (৫০), মোহাম্মদ পারভেজ (২৭) এবং মোহাম্মদ রাসুল (২০)। এরমধ্যে বাবলু আনসার সদস্য এবং বাকিরা বস্তিবাসী।
চমেকে চিকিৎসাধীন আহত মো. আলী রাজ হাসান সাগরের অবস্হা আশংকাজনক বলে জানান চিকিৎসক।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপকূলীয় উপজেলা ছাড়াও কক্সবাজার, বরিশাল, ভোলা, নোয়াখালী, কুমিল্লা সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জলবায়ু উদ্বাস্তু ও নিম্ন আয়ের মানুষের ঠিকানা হয়ে ওঠে ছিন্নমূল বস্তি।

১৯৮০ সালে জঙ্গল সলিমপুর মৌজায় ছিন্নমূল এলাকায় কয়েকটি পরিবারের বসবাস থাকলেও গত ২০/৩০ বছর থেকে মানুষের বসবাস করে আসতেছে কিন্তু এই ৮৫০ একর জমিতে গড়ে ওঠা এই বস্তিতে থাকে প্রায় দেড় এক লাখ মানুষের বসবাস যাদের বেশিরভাগই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনে বাধ্য হওয়া জনগোষ্ঠী।
জানা গেছে যে অভিযান শুরুর আগে জঙ্গল সলিমপুর এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রায় ২০০ সদস্যের পুলিশ ও আনসার বাহিনী সহ কিছু র্যাবের সদস্য নিয়ে এই অভিযান শুরু করেন।
অভিযানকারী দলের সাথে উপস্থিত ছিলেন সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল আলম।
জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শফিউল্লাহ বলেন, আত্নরক্ষার্থে পুলিশ রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। ‘এতে আমাদের কেউ হতাহত হয়নি। তবে কতজন বস্তিবাসী আহত হয়েছে তা আমরা জানি না।
বিগত সময়ে চট্টগ্রাম নগরের দেওয়ানহাট বস্তি, বাটালি হিল, মতিঝর্ণা, ঢেবার পাড় বস্তি, বরিশাল বস্তি, লালদিয়ার চর, নোমান বস্তিসহ অন্তত ২০টি বস্তি থেকে কয়েক হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। উচ্ছেদ হওয়া এসব মানুষের ও ঠিকানা হয়ে উঠতে থাকে এই ছিন্নমূল। সর্বশেষ ২০২১ সালে পুলিশ সুপারের পাহাড়, লালদিয়ারচর থেকে উচ্ছেদ হওয়া কয়েকশত ভূমিহীনদের ঠিকানা হয়েছিল এই বসতি। চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপকূলীয় উপজেলা ছাড়াও কক্সবাজার, বরিশাল, ভোলা, নোয়াখালী, কুমিল্লার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জলবায়ু উদ্বাস্তু ও নিম্ন আয়ের মানুষের ঠিকানা হয়ে ওঠে ছিন্নমূল।
চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ ২০০৪ সালে গড়ে ওঠে। সে সময় প্রতিটি ৬০ টাকার বিনিময়ে সদস্য হতে শুরু করেন ভূমিহীন পরিবারগুলো প্রতি প্লটের সীমানা ছিলো (৩৫ বাই ৪৫ বর্গফুট) হল। এই সংগঠনটিতে যখন সদস্য ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের বসতি বাড়তে থাকে তখন ক্রমান্বয়ে ১১টি সমাজের মাধ্যমে সুন্দর ভাবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য টিক রেখে বসবাস করেন। সরকারি কোনো সহায়তা না নিয়েই এই সময়ে তারা রাস্তাঘাট, বিদ্যালয়, মসজিদ আর মাদ্রাসা নির্মাণ করেছে।এই এলাকার দুই কিলোমিটার পাকা রাস্তা নিজস্ব অর্থায়নে বানিয়েছে বাসিন্দারা। বৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়ায়, বস্তির বাসিন্দারা বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া বিদ্যুৎ সংযোগ কিনে ব্যবহার করেন। স্থানীয় সাংসদ সদস্য সহ কিছু দাতব্য সংস্থাও এখানে মসজিদ, স্কুল ও মাদ্রাসা নির্মাণ করেছে।
ছিন্নমূলে আছে ৩টি প্রাথমিক ও ১টি উচ্চ বিদ্যালয়; ৪টি মাদ্রাসা, ১২টি মসজিদ, ৩টি কেজি স্কুল, ৩টি এতিমখানা, ৬টি গোরস্তান, ৫টি মন্দির, ২টি কিয়াং, ১টি চার্চ, একটি শ্মশান ও একটি কাচা বাজার, রয়েছে অন্ধ ও ট্রান্সজেন্ডার মানুষের জন্য বিশেষ জোন।
তবে গত ২৩ই জুন জেলা উন্নয়ণ কমিটির সমন্বয় সভায় জঙ্গল সলিমপুরের ৩১০০ একর খাস জমিতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, নভোথিয়েটার, স্পোর্টস ভিলেজ হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, জাতীয় তথ্যকেন্দ্র ও নাইট সাফারি পার্কসহ একাধিক সরকারি স্থাপনা তৈরীর পরিকল্পনার কথা জানান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোমিনুর রহমান। ২২ জুলাই থেকে ২৩ আগষ্ট পর্যন্ত নয়টি অভিযানে জঙ্গল সলিমপুরের আলী নগরের ১৭০ টি উচ্ছেদ করে জেলা প্রশাসন। ২৪ আগষ্ট জঙ্গল সলিমপুরে অবৈধ বসতিতে উচ্ছেদ অভিযানে প্রায় ১৭০টি স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট, বায়োজিদ থানা, সীতাকুণ্ড থানার পুলিশ কর্মকর্তাগণ জঙ্গল সলিমপুর ছিন্নমূল এলাকার প্রবেশমুখে নিরাপত্তা চৌকী বসানো হয়। এতে খাবারের গাড়ি সহ সব রকমের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসে গাড়ি, ঔষধের গাড়ি এমনকি লাশবাহী এম্বোলেন্সের প্রবেশ করতে বাধা দেয় পুলিশ, এলাকাবাসীর সাথে কাউকে সন্দেহ হলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায় তাদের খাবারের ও মালামাল গাড়ী ডুকতে না দেওয়ায় চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে এলাকার মানুষ এবং এটি মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে বলে এলাকাবাসী জানান।
এলাকাবাসীর দাবী আমাদের স্হায়ী বন্দোবস্হী নিশ্চিত করে সরকারি মহাপরিকল্পনা করলে আমাদের কোনো আপত্তি নাই আমরা সরকারী কাজে সার্বিক সহযোগিতা করবো।
জঙ্গল সালিমপুর উচ্ছেদ করতে গিয়ে এলাকাবাসীর মুখোমুখি আগ্রাসী প্রসাশন, নিজেদের ঘর বাড়ি রক্ষার জন্য সংঘর্ষ পুলিশের সাথে এলাকাবাসীর।