নির্যাতনের রাজনীতি পেরিয়ে মন্ত্রিসভায় নুরুল হক নুর

জাতীয় বাংলাদেশ রাজনীতি
প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:১৮
আরিফুল ইসলাম,চট্টগ্রাম

মিছিল দিয়ে নয়, আঘাত দিয়ে যার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু—তিনি নুরুল হক নুর।

ছাত্র আন্দোলনের ভেতর থেকেই রাজনীতিতে উত্থান। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী কর্মসূচি—প্রতিটি আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। রাজপথে সক্রিয় উপস্থিতি তাঁকে যেমন পরিচিত করেছে, তেমনি করেছে ঝুঁকিপূর্ণ।

২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচনে সহসভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর জাতীয় রাজনীতিতে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন নুর। এরপর হামলার ঘটনাও বাড়তে থাকে। কখনো ক্যাম্পাসে, কখনো মিছিল শেষে, কখনো নিজ গ্রামে। সহকর্মীদের ভাষায়—একসময় তাঁর শরীরের ক্ষতের চেয়ে মামলার ফাইলই ভারী হয়ে উঠেছিল।

গ্রেপ্তার, রিমান্ড, কারাবাস—সবই এসেছে রাজনৈতিক পথচলার অংশ হয়ে। ২০২৪ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়ে পাঁচ দিনের রিমান্ডে থাকতে হয় তাঁকে। কারাগারের অনিশ্চয়তা, নতুন মামলার আশঙ্কা—এসবই ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ২০২৫ সালের আগস্টে। জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে সংঘর্ষে মারাত্মক আহত হন তিনি। অবস্থার অবনতি হওয়ায় দেশে চিকিৎসা সম্ভব হয়নি; নিতে হয় বিদেশে। রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘটনাটি পরিচিত হয়ে আছে ‘নুরের সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায়’ হিসেবে।

সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্রের হলফনামায় উল্লেখ ছিল ১৫টি মামলা। পারিবারিক সূত্রে দাবি, হামলার ঘটনা আরও বেশি—ছোট ভাইয়ের ভাষ্যমতে অন্তত ২৮ বার আক্রমণের শিকার হয়েছেন তিনি।

নুর নিজেই একাধিকবার বলেছেন, “আমাকে রাজনীতি শিখিয়েছে ব্যথা।” হাসপাতালের বেড, থানার হাজতখানা, আদালতের বারান্দা—এসব জায়গাই ছিল তাঁর রাজনৈতিক শিক্ষার পাঠশালা। সংগঠন ও সমীকরণের বাইরে ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার উদাহরণ হিসেবেই তাঁকে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।

চরাঞ্চলের এক তরুণের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানোর গল্প—এটাই নুরুল হকের রাজনৈতিক আখ্যান। হামলা-মামলার ইতিহাসই আজ তাঁর রাজনৈতিক মূলধন। সেই পথ পেরিয়েই সংসদ, আর সেখান থেকে মন্ত্রিসভা।

ব্যক্তিগত জীবনেও সংগ্রামের ছাপ স্পষ্ট। চার ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে চতুর্থ নুর আড়াই বছর বয়সে মাকে হারান। বাবা ইদ্রিস হাওলাদার স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শৈশবের সীমাবদ্ধতা তাঁকে থামায়নি; বরং দৃঢ় করেছে।

পটুয়াখালীর গলাচিপার চরবিশ্বাসে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ঢাকায় পাড়ি। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের গোলাম নবী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর অধ্যয়ন শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকেই ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ।

নির্যাতনের রাজনীতি পেরিয়ে আজ তাঁর মন্ত্রিসভায় জায়গা পাওয়া—সমর্থকদের কাছে তা অধ্যবসায়ের স্বীকৃতি, আর সমালোচকদের কাছে এক বিতর্কিত অধ্যায়ের নতুন মোড়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—নুরুল হক নুরের রাজনৈতিক গল্পে ব্যথা যেমন আছে, তেমনি আছে টিকে থাকার এক অদম্য অধ্যায়।

নির্যাতনের রাজনীতি পেরিয়ে মন্ত্রিসভায় নুরুল হক নুর

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *